লেখাপড়া আর খেলাপড়া

In DiGRA India’s first post in an Indian language, Souvik Mukherjee writes in Bengali about the role of videogames in culture with an emphasis on narrative multiplicity, involvement, and the procedural rhetoric of the game that serve to influence the shaping of the player’s opinions. Mukherjee highlights the importance for both the Humanities and the social sciences to take into account videogames and their serious impact on people. He particularly aims to reach the lacuna present in the Bengali intellectual traditions regarding videogames as cultural media and encourage games researchers from all over India to write about their research in Indian languages.

বাংলায় বুদ্ধিজীবীগণ বিভিন্ন গল্প বলার মাধ্যম নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। কিন্তু হালের যেসব নতুন মিডিয়া এসেছে তা নিয়ে কোনো লেখা পাওয়া ভার। এর মধ্যে ডিজিটাল গেম বা ভিডিওগেম অন্যতম।  অবিশ্যি, বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কতজনই বা খেলেছেন এই ভিডিওগেম ? কোনও বিদগ্ধ বাঙালী বুদ্ধিজীবী জয়স্টিক ধরে এসাসিন’স ক্রিড খেলছেন এটা বোধহয় এ জীবনে দেখা হবে না। বৈদ্যুতিন মানবতত্ত্ব (ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ) নিয়ে অবিশ্যি কয়েকজনের বক্তব্য (যদিও খুবই অল্প) আছে,  যেমন আছে আরো খ্যাতনামা ব্যক্তিদের ।  তবে সে বক্তব্য বৈদ্যুতিন সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে নয়; এ বিষয় বেশিরভাগ গবেষণাই হল গ্রন্থ ও মুদ্রণ কেন্দ্রিক  – এছাড়া আছে বৈদ্যুতিন গ্রন্থ বা টেক্সট যেমন ‘বিচিত্রা’, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্মিত বৈদ্যুতিন রবীন্দ্র রচনাবলী। এসবের থেকে এসাসিন’স ক্রিড বা পাব জি অনেক দূরের কথা।  কিন্তু এটাও সত্য যে লক্ষ লক্ষ লোক, বয়স নির্বিশেষে ভিডিও গেমস এর মাধ্যমে গল্প পড়ছে বা জানছে বা খেলছে। হ্যাঁ , গল্প খেলছে বললেও ভুল হবে না।  সেই গল্পের শেষ নেই – যেকোনো খেলার মতো বারবার খেলা যায় এবং ক্যালভিনো  কোর্তাজার – এদের গল্পের মত একাধিক ভাবে এর সমাপ্তি।  এবং এই গল্প শুধু শ্রবণ বা পঠন করলেই চলে না  – এর উপভোগ শারীরিক, এর নিমগ্নতা আক্ষরিক। ভিডিওগেমের গল্প বলা নিয়ে চিন্তা অনেকদিনের। বিতর্কও অনেক। যেগুলির আঁচ বাংলায় লেখালেখির জগতে তেমন এসে পড়েনি। অথচ একাধিক প্রজন্ম ভিডিওগেম খেলে বড় হচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভিডিও গেম তৈরী হয়েছে, কলকাতার  দুর্গা পুজো নিয়েও তৈরী হচ্ছে ভিডিও গেম  – অবশ্য বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে জানা নেই।

নরওয়েজীয় অধ্যাপক এসপেন অরসেথ (বর্তমানে ডেনমার্কের ITU তে পড়ান) ১৯৯৭ সালে Cybertext শব্দের প্রচলন করেন।[1]  এর অর্থ যে পাঠ (text) তার লেখা বা তৈরির মাধ্যমের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল – অর্থাৎ কম্পিউটার নির্মিত পাঠ পড়তে গেলেই তার কোড এর দিকে নজর রেখে পড়তে হবে। এই cybertext এর মূল গুণ হল যে সে ergodic (এর্গোদিক)। Ergodic শব্দের উৎস ল্যাটিন ‘এর্গোস’ এবং ‘হদস’ অর্থাৎ কিনা যা কর্মের মাধ্যমে পাঠের পথ গড়ে দেয় । পড়তে গেলে বেশ গতর  খাটিয়ে পড়তে হয় এই বই । হয়তো বা LEGO র মত গল্পের টুকরো জুড়তে হয় নতুবা হাত পা চালিয়ে গলদঘর্ম হয়ে কিনা পড়তে হয় এই পাঠ। জয়স্টিক হাতে পড়তে হচ্ছে গল্প কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে টকাটক ঘা  মেরে চলেছে পাঠকের দল  – এ আবার কী রকম গল্প পড়া? অবিশ্যি, ভেবে দেখুন গল্পের পাঠক নির্ণয় করছেন গল্পের মোড় কোন দিকে ঘুরবে  – পাঠক হল লেখক । হজবরল দেখে ভাবতে গেলে বলতে হবে ‘এ আর নতুন কি!’  – ছিল রুমাল হয়ে গেলো বেড়াল, এ তো হামেশাই হয়।  তবে এ কথা সত্যিই তাজ্জব নয়।  লেখক-পাঠক নিয়ে রোলাঁ বার্থ অনেক আগেই লিখে গেছেন: ‘the birth of the reader must be at the cost of the death of the Author’।[2] আক্ষরিক অর্থে লেখককে মেরে ফেলেননি বার্থ সাহেব; পাঠককে দান করেছেন লেখকের সেই প্রায়-অসীম ক্ষমতা । পাঠক পড়তে পড়তে পাঠ  রচনা করে – সে-ই বনে যায় লেখক । ভিডিও গেমস-এর ক্ষেত্রে বলি : যে খেলছে সে-ই গল্প তৈরী করছে (এই খেলার নির্মাতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে) আবার সেই গল্পের পাঠক ও সে । অর্থাৎ রুমাল ও বেড়াল একই সঙ্গে যা কিনা কখনো বেড়াল কখনো রুমাল বা কখনো রুমাল-বেড়াল – মানে ওই চন্দ্রবিন্দুর চ বেড়ালের তালব্য শ আর   রুমালের মা আর কি । এর বেশি বলতে আমি নারাজ।

এসবের মধ্যেও উঠেছিল আরেকটা তুমুল তর্ক: ভিডিও গেম কি আদৌ গল্প বলে ? না কি অন্য  খেলার মত এই  খেলাও নিছক নিয়ম এবং কেবল কম্পিউটার প্রণালী? আসলে গল্প বলাতেও  আছে নিয়ম, প্রণালী। জেরার্ড জেনেট, স্ভেতান টোডরভ ও ভ্লাদিমির প্রপ্প প্রমুখ  পন্ডিত এই গল্প বলার নিয়ম এবং প্রণালী নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। ইতালীয় চিন্তাবিদ উমবের্তো একো সব কটি জেমস বন্ডের গল্প একই  ছকে ফেলে দেখিয়েছেন।[3] যা হোক, গল্পের এই খেলাসূলভ স্বভাব আর গল্প বলায় বা শোনায় নিয়মের মারপ্যাঁচ নতুন নয়। যেমন  ধরুন Alice – সে তো দাবার ছকের মধ্যে দিয়ে অনেক অদ্ভূত  রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার পর বাড়ি ফিরতে পারছে দাবা খেলার পরে। দাবার বোর্ডে বোড়ে ছিল Alice – কিন্তু সে বোর্ডের শেষ প্রান্তে পৌঁছে বনে গেল রানী (বাংলায় যাকে  বলি মন্ত্রী)। দাবার রানীর অবাধ বিচরণ। কাজেই Alice  বাড়ি ফিরল সহজেই। ভিডিও গেম-ও এরকম গল্প বলে। ফ্লোরেন্স  শহরের বাসিন্দা এৎসিও অডিটরে বদলা নিচ্ছে তার পিতৃহত্যা ও ভ্রাতৃহত্যার। নৃশংস টেম্পলার বাহিনীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি  আর নিকোলো মাকিয়াভেলীর সাথে। এসাসিন্স ক্রীড যিনি খেলছেন তিনি জানবেন যে অনেক গবেষণা করেই ফাঁদা হয়েছে এর গল্প। কিন্তু ভিডিওগেমের গল্প তো একটি নয় একাধিক।  একই গল্প বারবার খেললে ভিন্ন গল্প হয়ে দাঁড়ায়। কখনো দা ভিঞ্চির বিমান আকাশে ওড়ে (বাস্তবে অবশ্য সেই বিমান পরিকল্পনার সতর ছেড়ে ওড়েনি) , কখনো এৎসিও  ভূতলে পতিত হয় আর গল্প কিরম অকস্মাৎ সমাপ্ত হয়। এই যে গল্প, এটি একটি গল্প নয় – অনেক গল্প। একটি ‘multiplicity’, একটি বহুত্ব। যিনি ভিডিওগেম খেলেন তাঁর অভিজ্ঞতা (experience) তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং জয়স্টিক বা মাউস দিয়েও এখানে গল্প পড়া হচ্ছে, মনিটরের ওপর যে ছবি পড়ছে তাকেও নিয়ন্ত্রণ করছে যিনি খেলছেন। প্রিন্স অফ পার্সিয়া খেলায় পারস্যের রাজকুমার ক্রমাগত বলছেন ‘না না আমার গল্প এরম ভাবে শেষ হতে পারে না’ – যেন ইতালো ক্যালভিনোর এক কাহিনী পড়ছি।

খ্যাতনামা মার্কিন ভিডিওগেম বিশেষজ্ঞ ইয়ান বোগোস্ট বলেন যে ভিডিওগেমের এই গল্প বলার পেছনে লুকিয়ে থাকা যান্ত্রিক প্রণালী একরকমভাবে চিন্তনকে প্রভাবিত করে – ওঁর  ভাষায় একে  বলে Procedural  Rhetoric।[4] অর্থাৎ যান্ত্রিক প্রণালী মারফৎ মানুষকে একরকমভাবে চিন্তা করতে শেখানো। এর গুন  ও দোষ  বিচার করব না এখানে; তার জন্য অন্য আলোচনা, আরেকদিন হবে। তবে ভাবুন তো বিশ্বের কোটি কোটি লোক যখন একটি খেলার মাধ্যমে, বলতে পারেন খেলার ছলে, একটি আদর্শ কিংবা কারো মত অনুসরণ করতে শিখছেন। ধরুন একটি রাজনৈতিক সংকটকালে কি করা উচিত না উচিত সেই জ্ঞান যদি লোকে ভিডিওগেম থেকে অর্জন করে: ভিডিওগেমের যে affordances বা কিনা যে যে ঘটনা খেলার কাঠামোর মধ্যে ঘটতে পারে, যে যে ফল সম্ভব সেইগুলিকেই সঠিক ঠাওরান, তাহলে জনমত তৈরী করতে এর ক্ষমতা কতটা তা বলা বাহুল্য। কাজেই বোগোস্ট যা বলেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। খেলা কোনোদিন একেবারে বন্ধ করে দেওয়া যায়না আর খেলার মাধ্যমে অনেক চিন্তাই বদলানো যায়; এবং ভিডিওগেম শুধু খেলা নয়, গল্পও নয় – এ যেন আলাদা স্বতন্ত্র পৃথিবী। একটি উপন্যাসের গভীরে গিয়ে যেমন আমরা মাঝেমাঝে নিজের অজান্তেই শশী ডাক্তার কিংবা ঢোঁড়াই হয়ে যাই, ভিডিওগেমে তা আরো অহরহ ঘটে। 

আরো বেশি, কারণ এখানে গল্পের সুতো আমাদের হাতে, অন্ততপক্ষে তাই মনে হয়। অতএব একটু ভাবা যাক ভিডিওগেম নিয়ে। বইমেলাতে বা সাহিত্য সম্মেলনে নাই বা ঢুকতে দিলাম, লক্ষ লক্ষ মোবাইল ফোনে কিন্তু খেলা চলছে, গল্প তৈরী হচ্ছে এবং সেই গল্প অনেককেই প্রভাবিত করছে। তার স্রষ্টা জাপানি গেম ডিসাইনার হিদেও কোজিমা বা মার্কিন গেম কোম্পানি রকস্টার শুধু নন, এর স্রষ্টা পাঠক / গেমার (gamer) নিজে। কাজেই একটু ভেবে দেখি, নতুবা আরও ভালো, খেলে দেখি ।

[অধ্যাপক সুমিত চক্রবর্তী এ লেখাটির ব্যাপারে বহুবার উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁকে কৃতজ্ঞতা। সঙ্গে ধন্যবাদ জানাই আমার ছাত্র সৌরভ চট্টোপাধ্যায়কে।]

—শৌভিক মুখোপাধ্যায়

লেখক কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশাল সায়েন্সেস-এ কালচারাল স্টাডিজের অধ্যাপক

[1] এসপেন অরসেথ. সাইবারটেক্সট: পার্সপেক্টিভ অন এর্গোদিক লিটারেচার. জেএইচইউ প্রেস: ১৯৯৭

[2] রোলাঁ বার্থ. ইমেজ, মিউজিক, টেক্সট. ফন্টানা: ১৯৭৭, পৃঃ ১৪৮

[3] উমবের্তো একো. দ্য বন্ড অ্যাফেয়ার. ম্যাকমিলান: ১৯৬৬

[4] ইয়ান বোগোস্ট. পারসুয়েসিভ গেমস: দ্য এক্সপ্রেসিভ পাওয়ার অফ ভিডিওগেমস. এমআইটি প্রেস: ২০০৭

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: